রফিকুল কাদির: সম্রাট আকবর তাঁর প্রথিতযশা, প্রাজ্ঞ, জ্ঞানী জ্যোতির্বিদ ও পণ্ডিতদের তত্ত্ববধান ও গবেষণায় যে বর্ষপঞ্জী ভারতবর্ষকে উপহার দিলেন, তা সত্যিকার অর্থেই অবিশ্বাস্য ও অবিস্মরণীয়। অদ্ভুত সুন্দর এ বর্ষপঞ্জী যা আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে দিন, মাস ও ঋতুর পরিবর্তন নিখুঁতভাবে ও গভীরভাবে অনুভব করতে পারি। মাত্র একদিনের ব্যবধানেই সূর্যের রঙ-রূপের পরিবর্তন আর মাস বদলের ব্যবধানেই ঋতুর রূপের পরিবর্তন তথা আবহাওয়ার পরিবর্তন চোখে পড়ে। তাই বর্ষপঞ্জীটি আমাদের অজান্তেই বা অজ্ঞাতেই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। যেখানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ইংরেজি বর্ষপঞ্জীর সার্বজনীন, সামগ্রিক ও প্রধান হয়ে ওঠা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। সূর্যের রূপ, বৃষ্টির ফোঁটা, বাতাসের গতি, প্রবাহ, আদ্রতা, শীতলতা ইত্যাদি আমাদের ভাবতে বাধ্যকরে বঙ্গাব্দের মাস ও ঋতু নিয়ে। আমরা স্বতঃস্ফুর্তভাবেই আমাদের ঋতুভিত্তিক প্রস্তুতি নেই। যা আমাদের জীবনধারায় অবিচ্ছেদ্য।
যদিও পেশা ও বৃত্তিভেদে তার ভিন্নতা পরীলক্ষিত। যেমন, যখন কৃষক তার ঋতুভিত্তিক বিশেষ ফসলের কথা ভাবে, মহাজন তখন খাতা খুলে দাদন উন্মুক্ত করে, সার-বীজ, কোদাল-খুন্তির দোকানদারা পসরা খুলে বসে। আবার সেই ফসল তোলার সময় সরকার, জমিদারা, মহাজনসহ সকল পাওনাদার একইভাবে তাদরে দরজা হা করে খুলে রাখে, কৃষকের রক্ত-প্রবাহিত ফসল কতটা নিজেদের করায়ত্ত করা যায় সে আশায়। তার ভদ্রোচিত নামও তারা দেয়। কৃষককে সর্বশান্ত করার পরও তাদের পাওনা শেষ হয় না, পুরোনো খাতার পাতা ফুরিয়ে আসে। তাই শোষণের নবায়ন করতে খুলতে হয় নতুন খাতা। যার নাম দেয়া হয় ‘হালখাতা’। আর এই শোষণ-যন্ত্রকে গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধ করতে তার আগে যোগ করা হয় ‘শুভ’ শব্দটি। শুরু হলো ‘শুভ হালখাতা’! বৈশাখের খরতাপে জমিদার, মহাজনের পাওনা ও তার সুদে মুহ্যমানা সর্বশান্ত-কৃষকের জীবন ও জীবনীশক্তি টিকিয়ে রাখা ও বাড়ি ফেড়া নিশ্চিত করা ও মেকি ভাতৃত ও সৌহার্দের প্রতীক হিসেবে প্রতীকী মিষ্টান্ন বিতরণ। যা কোন অর্থেই কৃষক তথা সাধারনের উৎসব বা আনন্দের ঘটনা নয়। এটি কেবল সুন্দর সাজপোশাকের বর্ণীল আয়োজনে জমিদার ও মহাজনের ভয়ে ভীত কৃষক তথা সাধারনের নির্মম উৎসব মুখরতার কথাই বলে। যে উৎসব থেকে ফিরে কৃষক খালি-হাতে পঞ্জিকায় অজস্র দিন দেখতে পায়। তাই যথানিয়মে আবারও ভরে উঠতে থাকে মহাজনের নতুন খাতা তথা হালখাতা। সমানুপাতিক বা ব্যস্তানুপাতিক হারে বেড়ে চলে আনন্দ। তাই বাঙালির বৈশাখী আদৌ সাধারণের উৎসব নয়। একে সার্বজনীনতার রূপ দিয়ে মহাজন ও শোষক তার ও তাদের কুরূপ ঢেকে রাখে। রাখতে চায়।
হালখাতা বাদ দিলে বাংলায় বর্ষবরণের যে সংস্কৃতি, বিশেষত ঘটা করে পালনের যে প্রথা তার আবির্ভাব ইংরেজ আমলে। এটা তখনকার ভদ্রজনোচিত সংস্কৃতি যা ইংলিশ বা ইউরোপ হতে আমদানিকৃত এবং শহুরে ভদ্রসমাজেই সীমাবদ্ধ।
শহুরে ভদ্র সমাজের বাইরে বৈশাখী মেলার চল বাংলায় বিরল। তবে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা এখানকার আদি উৎসব। পুরনো বছরের শেষে নতুন বছরকে বরণ করতে, নিজেদের শুভ প্রাপ্তি করতে সবাই গঙ্গা স্নানসহ প্রার্থনা করে। তারই আশেপাশে বসে মেলা। সেই মেলায় কৃষি ও গৃহস্থালিতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি মনোহারী ও প্রয়োজনীয় রসনা কিনে সবাই বাড়ি ফিরে নতুন উদ্যমে। নতুন ফসলর আহ্বানে। নতুন দিনের আশায়।
আমি নিজেও নিজের এ ক্ষুদ্র জীবনের স্মৃতি হাতড়ে আমার জন্মভূমি যা নাটোর এবং বিশেষত নাটোর সদর ও নলডাঙ্গার কোন গ্রামে কোনো বৈশাখী মেলা বা উৎসবের কথা জানি না। যা বা যাদের কথা জানি তারা অতি নবীন ও বৃত্তাবদ্ধ।
এবং এ অঞ্চলে নব্বই দশক বা তৎপরবর্তী সময়ের বৈশাখী উৎসবের নব-প্রবর্তক ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি, নাটোর ও তার সদস্যগণ। যারা শিক্ষিত ও ভদ্রসমাজের লোক। এবং স্বীয় সংস্কৃতিচর্চা ধারক।
তাই বৈশাখী উৎসব আমার কাছে কখনোই সার্বজনীন উৎসব নয়। ছিল না। হয়েও ওঠে নি। সরকার ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যা-ই বলুক তা সেই অতিকথিত ভদ্র সমাজেই সীমাবদ্ধ। কেবল তারই গাইছে, ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো…’। বুঝে গাইছে। না বুঝে গাইছে। গাওয়ার জন্য গাইছে। স্রোতে সামিল হতে গাইছে।
যাহোক আজকের কথায় আসি। বাংলাদেশসহ বিশ্ব আজ সংকটের মাঝ দিয়ে তীব্র সংকটের দিকে এগুচ্ছে। বৈশাখী উৎসবের আতুরঘর মহানগর, নগর ও মফস্বলের উৎসবের অংশভাগ যারা তারা আজ ফুয়েল পাম্পে সারিবদ্ধ বাইকের সাথে সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান। যদিও জানিনা আজ নববর্ষের এই দিনে তাদের এ দণ্ডায়মানতা কতটা কষ্টের আর কতটা উৎসবমুখর।
সবাইকে পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা।



