আশিকুর রহমান : দেশের বিভিন্ন জেলার মতো নাটোরেও হঠাৎ করেই শিশুদের মাঝে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাইফাতুল কাশফি নামের সাড়ে তিন মাস বয়সী নাটোরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া জেলায় আক্রান্ত অধিকাংশ শিশুর বয়সই ৯ মাসের কম, যাদের এখনও হামের টিকা দেওয়ার বয়স হয়নি। নিহত শিশু কাশফি নাটোর সদর উপজেলার বড় হরিশপুর ইউনিয়নের ঋষি নওগাঁ এলাকার সাইফুল ইসলামের মেয়ে।
নিহত শিশুর বাবা সাইফুল ইসলাম জানান, গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) সকালে ঠান্ডা ও জ্বর নিয়ে নাটোর সদর হাসপাতালে কাশফিকে ভর্তি করা হয়। শুরুতে সে কান্নাকাটি করলেও বিকেল থেকে সারা শব্দ বন্ধ করে দেয়। পরদিন শনিবার স্বজনরা খেয়াল করেন, তার গলার ভেতর হামের মতো গুটি বেরিয়েছে, যা রোববার পুরো শরীরে ফুটে ওঠে। অবস্থার অবনতি হলে সোমবার রাতে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে তার মৃত্যু হয়। নাটোর সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের নমুনা পরীক্ষার পর ১৩ জন শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়। ইতোমধ্যে ৯ জন শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। একজনকে রাজশাহীতে পাঠানো হয়েছিল (যার মৃত্যু হয়েছে) এবং বর্তমানে সদর হাসপাতালে ৩ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে নাটোর সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, ৪১৫ নম্বর কক্ষে হামে আক্রান্ত শিশুদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসাধীন সব শিশুর বয়সই ৯ মাসের কম।
আক্রান্ত শিশুদের স্বজনরা জানান, শুরুতে চিকিৎসকরা সাধারণ ঠান্ডা-জ্বর মনে করে আক্রান্তদের শিশু ওয়ার্ডে অন্য রোগীদের সাথেই ভর্তি করেন। এক-দুই দিন পর শরীরে র্যাশ উঠলে এবং হাম সন্দেহ হওয়ার পর তাদের আলাদা কক্ষে (আইসোলেশন) নেওয়া হয়। এতে সাধারণ শিশুদের মাঝেও হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বড়াইগ্রাম থেকে ঠান্ডা ও জ্বরের লক্ষণ নিয়ে ৭ মাস বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আলীকে গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাতে হাসপাতালে নিয়ে আসেন শাহনাজ বেগম। তিনি বলেন, গত সোমবার হঠাৎ জ্বর আসে। গ্রামের ডাক্তার দেখিয়ে না কমায় শুক্রবার সদর হাসপাতালে ভর্তি করি। এক রাত সাধারণ শিশু ওয়ার্ডে থাকার পর শনিবার সকালে আমাদের এই আলাদা রুমে পাঠানো হয়। একই উপসর্গ নিয়ে সদর উপজেলার ছাতনি এলাকা থেকে সাত মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন ফাতেমা খাতুন (২০)। সপ্তাহখানেক আগে জ্বর ও কাশি শুরু হলে সোমবার তিনি হাসপাতালে আসেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ভর্তি হন।
এসব বিষয়ে নাটোরের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, জেলায় ৩৮ জন শিশুর হামের প্রাথমিক উপসর্গ ছিল, যার মধ্যে ১৩ জনের হাম পজিটিভ আসে। মৃত শিশুটির হাম ছিল কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়। পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে, রিপোর্ট হাতে পেলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।
শনাক্তের আগে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, শুরুতে হাসপাতালে দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তবে এখন কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে, হাম সন্দেহ হলেই শুরু থেকে আইসোলেশনে রাখতে হবে।
জেলায় হামের টিকা প্রদান কার্যক্রম চলমান এবং পর্যাপ্ত টিকার মজুত আছে জানিয়ে সিভিল সার্জন আরও বলেন, যাদের হাম হচ্ছে তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ৯ মাসের কম। ৯ মাসের আগে শিশুদের হামের টিকা প্রদানের কোনো সুযোগ নেই। তাই এই বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।



