মিজানুর রহমান, বাগাতিপাড়া: নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ঔপনিবেশিক শিল্পোন্নয়নের নানা স্মৃতি ছড়িয়ে রয়েছে এ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে। পদ্মা নদীর শাখা বড়াল নদ থেকে উৎপন্ন বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় একটি নদী একসময় এ অঞ্চলের ভূগোল, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সেই নদীকেন্দ্রিক জনপদের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে একটি প্রাচীন স্থাপনা ‘আবদালের মসজিদ’। দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় মসজিদটি আজ প্রায় বিস্মৃত এক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে।
লোকমুখে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, বড়াল নদ থেকে উৎপন্ন একটি নদী একসময় বাগাতিপাড়া অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। নদীটি শুধু একটি জলধারা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এর ওপর গড়ে উঠেছিল একটি সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা। এ অঞ্চলে প্রচুর ঝিনুক ও শামুক পাওয়া যেত। এসব ঝিনুক ও শামুক পুড়িয়ে তৈরি করা হতো চুন, যা তৎকালীন নির্মাণশিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল।
প্রাচীন বাংলায় দালানকোঠার গাঁথুনি, প্লাস্টার এবং অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে চুনের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। ফলে ঝিনুক ও শামুক থেকে চুন উৎপাদনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে গড়ে ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বিশেষ একটি জনগোষ্ঠী ‘আবদাল’ সম্প্রদায়। ‘আবদাল’ শব্দের অর্থ সাধক বা দরবেশ শ্রেণির মানুষ হলেও এ অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে এটি একটি পেশাভিত্তিক মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নির্দেশ করে। তারা মূলত চুন উৎপাদন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিল।
বাগাতিপাড়া উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণাকারী (অব) উপজেলা আনসার ও ভিডিপি অফিসার আজিজুর রহমান এর তথ্য সুত্রে জানা যায়, প্রায় ৩০০ বছর আগে সম্ভবত বাংলায় নবাবি শাসনের প্রতিষ্ঠাতা নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ (১৯০০-১৯২৭)-এর শাসনামলে বাগাতিপাড়া উপজেলার চকমাহাপুর গ্রামে নদীর তীরে আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন এ মসজিদ নির্মাণ করেন। স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণকৌশলের দিক থেকে মসজিদটি ছিল অত্যন্ত উন্নতমানের। তৎকালীন গ্রামীণ স্থাপত্যের বিবেচনায় এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী নিদর্শন। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ধীরে ধীরে ‘আবদালের মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। কালের পরিক্রমায় এ অঞ্চলের নদ-নদী, খাল-বিল ধীরে ধীরে ভরাট হতে শুরু করে। এর ফলে ঝিনুক ও শামুকের প্রাপ্যতা কমে যায়। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় চুন উৎপাদনের ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিও। চুনশিল্পের অবসানের ফলে আবদাল সম্প্রদায়ের বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে এবং জীবিকার তাগিদে বিকল্প পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। পেশাগত এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামাজিক অবস্থানেও পরিবর্তন আসে। একসময় তারা মূলধারার সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আবদাল সম্প্রদায়ের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তাদের নির্মিত মসজিদটিও ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় মসজিদটি একসময় জঙ্গলে ঢেকে যায় এবং বর্তমানে এটি বিলুপ্তপ্রায় একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বা সরকারি পর্যায়ে এখন পর্যন্ত এর সংরক্ষণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহনকারী এই স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ইতিহাসের অন্তরালে হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ একটি মসজিদ কখনোই এভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার কথা নয়। মসজিদ আল্লাহর ঘর—যত দিন মানুষের ঈমান ও ধর্মীয় চেতনা থাকবে, তত দিন মসজিদও জীবন্ত থাকার কথা। তাই যথাযথ গবেষণা, প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে ‘আবদালের মসজিদ’-কে পুনরুজ্জীবিত করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহ্য কেবল লোককথার একটি অস্পষ্ট অধ্যায় হিসেবেই রয়ে যেতে পারে।



