নাজমুল হাসান: নাটোর পাসপোর্ট অফিসের অনিয়ম, দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটি। গেল সোমবার (৩আগষ্ট) দুপুরে অধিদপ্তরটির প্রধান কার্যালয়ের অফিস পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার উপ-পরিচালক ড. মোঃ হাফিজুর রহমান শহরের বড়হরিশপুর এলাকায় পাসপোর্ট অফিসটিতে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ড. মোঃ হাফিজুর রহমান জানান, গত ০৮ জুলাই যমুনা টেলিভিশনে নাটোর পাসপোর্ট অফিসের অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে একটি অনুসন্ধানী সংবাদ প্রচার হয়। সংবাদটি নজরে আসার পর ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোঃ নূরুল আনোয়ারের নির্দেশে গত ৩০ জুলাই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই মোতাবেক গতকাল অফিসটির জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জাহিদুল হক, সকল কর্মকর্তা, কম্পিউটারের দোকানদার, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য নেয়া হয়। যথাসময়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে বলে জানান তিনি। এর আগে তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক আসমা শাহীনের সাথে তার কার্যালয়ে দেখা করেন।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটিতে উঠে আসে, নাটোর শহরের বড় হরিশপুর এলাকায় অবস্থিত আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ঘিরে দালালদের সক্রিয় সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। পাসপোর্ট অফিসের বাইরে ও বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা অধিকাংশ কম্পিউটারের দোকান হয়ে উঠেছে দালালচক্রের প্রাণকেন্দ্র। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, পাসপোর্ট প্রতি পনের’শ টাকা ঘুষ না দিলে নানা অজুহাতে আবেদন ফর্ম ফেরত দেয়া হয়।
তথ্যে আরও উঠে আসে, নাটোরের সিংড়া উপজেলার বাসিন্দা বিষ্ণু কুমার সরকার- ছেলে ও তার বন্ধুর পাসপোর্ট করতে এসে জটিলতায় পড়েন। ডাকঘর সংক্রান্ত ভুল দেখিয়ে পাসপোর্ট আবেদন দুটি ফেরত দেয়া হয়। পরে কোন উপায় না পেয়ে দালালের স্মরণাপন্ন হন তিনি। পরে দুই পাসপোর্টের জন্য দালাল সুলতান আহমেদের কাছে তিন হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে আবেদন জমা দেন।
বিষ্ণু কুমার সরকার জানান, তার ছেলে দীপ্ত সরকার কৌশিক ও তার বন্ধু শেফাত বিশ্বাসের পাসপোর্ট আবেদন নিয়ে গত ৫ জুলাই নাটোর পাসপোর্ট অফিসের জমা কাউন্টারে যান। সেখানে ডাটা এট্রি অফিসার কাউসার ইসলাম তাদের আবেদন দুটি জমা না নিয়ে জানান, ন্যাশনাল আইডিতে ডাকঘর ভাগনাগরকান্দি থাকলেও আবেদনে সিংড়া লেখা আছে। অনলাইনে আবেদনে ভাগনাগরকান্দি আসে না বলার পরও তিনি আবেদন দুটি জমা নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে তিনি পাসপোর্ট অফিসের পাশে সুলতান কম্পিউটারের প্রোপাইটর সুলতান আহমেদের কাছে গেলে তিনি জানান, এক একটি আবেদনের জন্য পনের’শ টাকা করে অতিরিক্ত দিলে কোনই ভুল ধরবে না পাসপোর্টে অফিসের কর্মকর্তারা। পরে সুলতানের কাছে তিনহাজার টাকা দেবার পর তিনি আবেদন দুটিতে গোপন সংকেত লিখে দেন। কিছুক্ষণ পর আবেদন ফিরিয়ে দেয়া সেই ডাটা এট্রি অফিসার কাউসার ইসলামই সেই আবেদন দুটি জমা নেন। পরে তারা ফিঙ্গার কার্যক্রম সম্পন্ন করেন ।
সেবাগ্রহিতা সেজে এই প্রতিবেদক সুলতানকে ফোন দিয়ে পাসপোর্ট প্রতি কতো টাকা করে দিতে হবে এমন প্রশ্নে কোনও রাখঢাক না রেখেই নির্দিষ্ট পরিমান অর্থাৎ পাসপোর্ট প্রকি ১৫শ টাকা ঘুষের কথা বলেন তিনি। সেই সাথে জানান, অতিরিক্ত টাকা দিলে পাসপোর্ট করতে কোনও বাড়তি ঝামেলা হবেনা।
অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে দেখা মেলে সদর উপজেলার গুনারী গ্রামের বাসিন্দা অহেদ আলীর সাথে। তিনি জানান, ওমরা হজ্ব করার জন্য পাসপোর্ট করতে গিয়ে তিনি মহা বিড়ম্বনায় পড়েছেন। আবেদনপত্রের সাথে কাবিননামা না থাকায় তার আবেদন জমা নেয়া হচ্ছে না। ২৭ বছর আগে বিয়ে করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন পর কাবিননামা জোগার করতে এক সপ্তাহ ধরে ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে হয়রানির স্বীকার হচ্ছেন তিনি।
অহেদ আলীকে সাথে নিয়ে গত ৫জুন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নাটোর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে নজরদারী শুরু করা হয়। লাইন ধরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর অহেদ আলী আবেদন জমা দিলে কাবিননামা না থাকার অজুহাতে আবারো তাকে ফিরিয়ে দেন ডাটা এট্রি অফিসার কাউসার ইসলাম। পরে অহেদ আলী অফিস থেকে বেড়িয়ে সেবা কম্পিউটারে যান। সেখানে তিনি দালাল শফিকুল ইসলামকে পনের’শ টাকা ঘুষ দেন। কাবিননামা, আইডিকার্ড না থাকার অজুহাতে ফিরিয়ে দেয়া আবেদনটি মুহুর্তেই জমা নেন পাসপোর্ট অফিসের সহকারী হিসাব রক্ষক মোহাম্মদ আনসারুজ্জামান ।
কেন ফিরিয়ে দেয়া আবেদন মুহুর্তেই জমা নেয়া হলো এমন প্রশ্নে কোনই সদুত্তর নেই পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের কাছে।
নাটোর পাসপোর্ট অফিসের ডাটা এট্রি অফিসার কাউসার ইসলাম মুহুর্তেই সব অস্বীকার করে বলেন, কাগজপত্র ঠিক না থাকলে কোনও আবেদন জমা হবেনা। তিনি কোনও প্রকার দুর্নীতির সাথে জড়িত না। এমন প্রমান কেউ দিতে পারবেন না বলে জোর গলায় বলেন তিনি।
সহকারী হিসাব রক্ষক মোহাম্মদ আনসারুজ্জামান বলেন, এখানে ইন্টারভিউ নিতে হলে স্যারের অনুমতি নিতে হবে। তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
সেবা কম্পিউটারের শফিকুল ইসলাম প্রথমে সব অস্বীকার করেন। পরে ঘুষ নেবার ভিডিও দেখালে তিনি থ হয়ে যান। একইভাবে দালাল সুলতান ঘুষ চাওয়ার অডিও শুনে থমকে যান। একপর্যায়ে সুলতান স্বীকার করেন তিনি নিজে তিনশ’ টাকা রেখে অফিসের কর্মকর্তাদের পাসপোর্ট প্রতি ১২শ টাকা দেন।
অনুসন্ধানের সময় একে একে মুখ খুলতে করেন হয়রানির স্বীকার একাধিক ভুক্তভোগী। এমন অনিয়ম বন্ধে কঠোর প্রদক্ষেপ চান তারা।
লাগামহীন দুর্নীতির বিষয়ে ব্যবস্থা নেবার গৎবাঁধা আশ্বাস দেন পাসপোর্ট অফিসের সরকারী পরিচালক মোহাম্মদ জাহিদুল হক। তিনি বলেন সকল অনিয়ম খতিয়ে দেখবেন। অফিসের কর্তা হয়ে এমন দুর্নীতির দায় তিনি এড়াতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নেরও কোনও উত্তর নেই তার কাছে। এই অপতৎপরতা বন্ধে কার্যকর প্রদক্ষেপ নেবার কথা জানান জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন। তিনি জানান, পাসপোর্ট অফিসের অনিয়মের বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। বিষয় তদন্ত করে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন।
বিষয়টি অবগত হয়ে নাটোর ০২ আসনের সংসদ সদস্য ও সরকার দলীয় হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু জানান, এই অনিয়ম বদ্ধে কার্যকর প্রদক্ষেপ নেবার ঘোষনা দেন তিনি।
২০১৪ সালে নাটোর শহরের চকরামপুর এলাকায় নাটোর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০২৩ সালে তা বড় হরিশপুর এলাকায় নিজস্ব ভবনে স্থানান্তর করা হয়। নানা সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায় থাকা এই পাসপোর্ট অফিসটি ঘিরে সম্প্রতি আবারো লাগামহীন হয়ে উঠেছে একাধিক দালাল চক্র।



