মামুনুর রশীদ: নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ছাত্রদলের হামলা, ভাঙচুর এবং সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরের পরদিনই নাটোরের জেলা প্রশাসককে (ডিসি) প্রত্যাহার এবং লালপুরের ইউএনওকে বদলি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে এই বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এই আকস্মিক বদলিকে কেন্দ্র করে নাটোরের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের পদে থেকে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কারণেই এই কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বরমান হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে নাটোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, রাজশাহী বিভাগীয় সিনিয়র সহকারী কমিশনার প্রীতিলতা বর্মণ স্বাক্ষরিত অপর এক আদেশে লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বরকত উল্লাহকে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বদলি করা হয়। এ দিকে একই দিনে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম বজলুর রশীদকেও প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে নাটোর জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বুধবার দুপুরে বলেন, তাকে প্রত্যাহার এটা সরকারি চাকুরীর একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তিনি দুই বছর থেকে নাটোরে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বে আছেন। চলে যাওয়ার সময় হয়েছে তাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এর বাহিরে অন্য কিছু নয়। এর আগে গত ১২ আগস্ট ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষের জেরে লালপুর ও বাগাতিপাড়া ইউএনও কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করে এবং এসব ঘটনার ছবি ও ভিডিও করায় সাত সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে। সমালোচনার জের ধরে বাগাতিপাড়া কাউকে বহিস্কার না করলেও লালপুর উপজেলা ছাত্রদল তাদের তিন কর্মীকে বহিস্কার করে। ১৭ আগস্ট সোমবার এ ঘটনায় লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু মাসুদ রানা এবং পরের দিন মঙ্গলবার বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. শুকুর আলী বাদী হয়ে নিজ নিজ থানায় দুটি এজাহার দায়ের করেন। এজাহার দুটিতে সরকারদলীয় ২৫ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৪০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়। লালপুরের দায়ের করা এজাহারে অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. হারুন অর রশিদ পাপ্পু, গোপালপুর পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাবেক মেয়র মো. নজরুল ইসলাম মোলাম, বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিক আলী মিষ্টু, ঈশ্বরদী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান মো. আব্দুল আজিজ রঞ্জু এবং উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রায়হান কবীর সুইট ও উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবু রায়হান। এছাড়া অজ্ঞাত আরও ৫০-৬০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, বাগাতিপাড়ায় দায়ের করা এজাহারে অভিযুক্ত সাতজন হলেন- উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানা, যুগ্ম আহ্বায়ক তারিক আজিজ, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য আশিকুর রহমান, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোশারফ হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, বাগাতিপাড়া পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোতালেব আলী পান্না এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সাব্বির হোসেন মুন্না। দায়েরকৃত এজাহারে অজ্ঞাত আরও ১০০-১৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই ঘটনায় জেলার সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, হামলাকারী ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় যদি কর্মকর্তাদেরই বদলির শিকার হতে হয়, তবে মাঠ প্রশাসনে সৎ ও নির্ভীক কর্মকর্তাদের পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে। নাটোর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ থাকলে মামলা করতে কোনো আপত্তি নেই। তবে এখানে ঢালাওভাবে বিএনপির উপজেলা, ইউনিয়ন ও পৌর কমিটির শীর্ষ নেতাদের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। তিনি বলেন, দলকে হেয় করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে নেতাকর্মীদের মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। মামলায় আসামিদের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা না উল্লেখ করে দলীয় পদ-পদবি উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় যারা প্রকৃতভাবে জড়িত, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে বিএনপি। মামলা দায়েরের বিষয়ে জানতে চাইলে নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরিফুল হক বলেছেন, অফিসিয়ালি এখনো বলার মতো তিনি কিছু জানেন না।



