মোঃ ফজলে রাব্বি, বাগাতিপাড়া: নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এক ধরনের অভিনব কৌশল ব্যবহার করে গাছ নিধনের ঘটনা সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যে গাছ কাটতে না পেরে রাতের অন্ধকারে গাছের ছাল কেটে ও গর্ত করে ধীরে ধীরে সেগুলো মেরে ফেলা হচ্ছে। এতে অর্ধশতাধিক বড় বড় গাছ ইতোমধ্যে শুকিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, গাছ শুধু কাঠের উৎস নয়, এটি মানুষের জীবন ও পরিবেশ রক্ষার অন্যতম স্তম্ভ। তাই পরিকল্পিতভাবে গাছ ধ্বংসের এই প্রবণতা বন্ধে দ্রুত তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করার সাহসও কেউ পাবে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার পৌরসভার লক্ষণহাটী, জামনগর ইউনিয়নের বাজিতপুর থেকে রহিমানপুর ও কালিকাপুর অভিমুখের সড়কের পাশে এবং রহিমানপুর গোরস্থান সংলগ্ন এলাকায় আবার সদর ইউনিয়নের কসবা এলাকায় একই ধরনের চিত্র চোখে পড়েছে। বড় বড় কড়ই জাতের গাছের গোড়া থেকে প্রায় ৩-৪ ফুট পর্যন্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছাল তুলে ফেলা হয়েছে। আবার কিছু গাছে রিং আকৃতিতে ছোট ছোট গর্ত করা হয়েছে। ফলে গাছগুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে মারা যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যাদের বাড়ির সামনে বা ফসলি জমির পাশে রাস্তার ধারে বড় গাছ রয়েছে, তাদের মধ্যেই কেউ কেউ গাছগুলো সরিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে এই জঘন্য পদ্ধতি অবলম্বন করছেন। কারণ গাছগুলো সরকারি জমির ওপর থাকায় প্রকাশ্যে কাটার সুযোগ নেই। তাই লোকচক্ষুর আড়ালে বা রাতের অন্ধকারে গাছগুলোর ছাল কেটে ধীরে ধীরে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের মতে একটি পূর্ণবয়স্ক কড়ই গাছের মূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা হতে পারে। কিন্তু শুধু অর্থমূল্য নয়, একটি গাছ বহু বছর ধরে পরিবেশকে সুরক্ষা দেয়, ছায়া দেয়, পাখি ও প্রাণীদের আশ্রয় দেয়। এভাবে পরিকল্পিতভাবে গাছ ধ্বংস করা হলে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। রহিমানপুর এলাকার মাঠে কাজ করা কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, গাছগুলো মেরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এই কাজ করা হয়েছে। বড় বড় গাছগুলোকে চিহ্নিত করে রাতের অন্ধকারে ছাল কেটে দেওয়া হয়েছে। সবাই বিষয়টা জানলেও কেউ প্রকাশ করতে চায় না। সঠিকভাবে তদন্ত করলে দোষীদের খুঁজে বের করা সম্ভব।
জামনগর ইউনিয়নে ওই এলাকার স্থানীয় মেম্বার মজিদ আলী জানান, কিছুদিন হচ্ছে বিষয়টি তিনিও লক্ষ করেছেন। তবে যে বা যারাই এ কাজ করেছে তারা অত্যন্ত অন্যায় করেছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সবুজ বাংলার সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী বলেন, রাস্তার পাশের বড় বড় গাছগুলো শুধু পরিবেশের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এগুলো জীববৈচিত্র রক্ষা ও জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিকল্পিতভাবে গাছের ছাল কেটে বা গর্ত করে ধীরে ধীরে মেরে ফেলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর একটি কাজ। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসন ও বন বিভাগের দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষকে সচেতন হয়ে এসব গাছ রক্ষায় এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি। উপজেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবিএম আব্দুল্লাহ জানান, সরকারি জমি বা রাস্তার পাশের গাছ ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, গাছ পরিবেশের গুরুত্বপর্ণ সম্পদ। যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে গাছ নষ্ট করে থাকে, তাহলে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



