একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা নিয়ে আমার যে অবস্থা ছিলো কিংবা পরীক্ষার নম্বর এমন পর্যায়ে থাকতো যে, বাংলায় (অনার্স) পড়লে নির্ঘাত ফেল করবো এমন আশঙ্কাই হতো। এই আশঙ্কা থেকে বাংলা নিয়ে উচ্চতর কোনো পড়ালেখা করার ব্যাপারে চিন্তাই করিনি। অবশ্য আমাদের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বিষয় ধরে ধরে পরীক্ষায় অংশ নিতে হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষায় একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে নৈর্ব্যক্তিক কিছু প্রশ্ন আসতো। এই প্রশ্নগুলো হতো পাঠ্যবইয়ে খুব গভীর থেকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য এইচএসসি পাসের পর গভীর মনোযোগ সহকারে পাঠ্যবই পড়া শুরু করলাম। তখনকার বাংলা পাঠ্যসূচিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘হৈমন্তী’ ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিলাসী’ ছিলো। ভর্তি পরীক্ষার জন্য এগুলো একটু মন দিয়ে পড়তে গিয়ে কখন জানি বাংলা সাহিত্যের প্রেমে পড়ে যাই। এই দুটি গল্প যে আমি কত শতবার পড়েছি, তার ইয়ত্তা নেই!
শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হই এবং আস্তে আস্তে সাহিত্য সম্পর্কিত পড়ালেখা বাড়তে থাকে। যদিও আমার বিষয় ছিলো সাহিত্য থেকে খানিক দূরে লোকপ্রশাসন। তবে ওই যে ভালো লাগা, তা থেকে সহপাঠীদের কাছ থেকে বই ধার করা, বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, বিভিন্ন দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকী পড়ার নেশা ধরে যায়। ফলে আমার পাঠ্য বিষয় তেমন আর পড়া হয়ে ওঠেনি। অবশ্য আরও একটা কারণ আছে- আমার বাড়ি যেহেতু নাটোরে আর পড়েছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, ফলে গ্রাম থেকে রাজশাহীতে আসা নানা শ্রেণিপেশার মানুষের বিচিত্র সমস্যার সমাধান করতে হতো আমাকে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকতো রাজশাহী মেডিকেলে আসা রোগীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্যা।
যাইহোক, ধীরে ধীরে বইয়ের সঙ্গে দৈনিক সংবাদপত্রের সাহিত্য সাময়িকী পড়াটা প্রাধান্য পেতে থাকে। আমি সবচেয়ে বেশি পড়েছি, ‘ভোরের কাগজ’ ও ‘প্রথম আলো’র সাহিত্য সাময়িকী। এ ক্ষেত্রে একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়, ২০ বছর আগে ‘প্রথম আলো’য় একটা ফিচার পড়েছিলাম; ২০ বছর পর সেই ফিচার লেখক সাংবাদিক আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ-এর সঙ্গে পরিচয় হলে তাকে বলেছিলাম সেই ফিচারের কথা। তিনি খুব আশ্চর্য হয়েছিলেন আমার কথা শুনে- ‘আমি তো নিজেই ভুলে গেছি, আপনি হৃদয়ে গেঁথে রেখেছেন! আপনি তো ভালো পাঠক!’ তখনকার এরকম অনেক কিছুই অনেকদিন পর্যন্ত আমার হৃদয়ে গেঁথে ছিলো।
দুই.
দিনক্ষণ মনে নেই, ‘প্রথম আলো’র সাহিত্য সাময়িকী ‘অন্য আলো’ তখন নিয়মিত পড়তাম। কোনো একটা সংখ্যায় পেলাম ভারতীয় বংশোদ্ভূত নোবেল জয়ী লেখক ভি এস নাইপল’কে নিয়ে লেখা। আমি দৈনিক পত্রিকা যেভাবে পড়ি মানে খানিক ভাসা-ভাসা, সেভাবেই পড়ছিলাম। কিন্তু কখন জানি সেই লেখার একটি বিষয় বুকের ভিতরে তীর ছোড়ার মতোই বিঁধে গেল। বিষয়টি ছিলো, স্থান ও স্থানচ্যূতি। কোনো গোষ্ঠী বা কোনো এক দল মানুষ যখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যায়, পূর্ববর্তী স্থানের জন্য তাদের বুকের মধ্যে কান্না, আবেগ, ভালোবাসা, আকুতি প্রকাশ পায়। চোখে ছলছল পানি আসার মতো নিদারুণ স্থানচ্যূতির অধ্যায়টি আমিও দেখেছি আমার বাবা-চাচা-দাদাদের মধ্যে। সাহিত্যের মতো প্রকাশ পাওয়া তেমন কোনো প্রত্যয় যদিও তাদের কাছে দেখিনি। তবে প্রতি বছর বা প্রতি ছয় মাস পর আমার দাদাদের পাঁচ ভাইয়ের ১৮ সন্তানদের মধ্যে যে কেউ অথবা তাদের সন্তানদের মধ্যে অনেকেই বা দাদাদের মধ্যে কেউ না কেউ দেশে যেত বা যাওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকত। আমার প্রজন্ম নাটোরে বেড়ে উঠলেও আমার দাদা-বাবা-চাচারা দেশ বলতে তাদের পূর্বপুরুষের বাসস্থান টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরকে বুঝতো। ফলে দেশ থেকে ফিরে এসেই তারা সবাই মিলে আবেগী সব আলোচনায় মত্ত থাকতো। যারা যেতে পারতো না. তাদের মধ্যে থাকতো দেশে না যাওয়ার জন্য চরম ব্যাকুলতা।
ভি এস নাইপলের স্থানচ্যূতির বেদনা আর আমার পরিবারের সদস্যদের দেশে যাওয়া, না যাওয়ার বাস্তবতার বেদনা কত বড়ো মাপের পাথর বুকে রাখার কষ্ট, তা সেই সময় আমি টের না পেলেও, এখন হৃদয় থেকে অনুভব করতে পারি! বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা একই ধাঁচের প্রকাশ না পাওয়া আর্তনাদের উপলব্ধি আমাকে এখনো বিমর্ষ করে।
তিন.
আমার দাদাদের ছয় ভাইয়ের মধ্যে পাঁচ ভাই ভূঞাপুর থেকে নাটোরে বসবাস শুরু করেন ৯০-৯৫ বছর আগে। তাদের তৎকালীন সাংসারিক অবস্থা থেকে আরও ভালোভাবে চলার পথ দেখানোর কাজটি যিনি করেছিলেন, তিনি হলেন আমার দাদাদের বাবার চাচাতো ভাই প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ। সর্বজনবিদিত প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। অনেকেরই হয়তো জানা। শুধু আমার বাবা-চাচা-দাদাদের কাছে তাঁর সম্বন্ধে যে গল্পগুলো শুনেছি, তা নিয়ে দুটি কথা না বললেই নয়। প্রিন্সিপাল সাহেব ১৮টা ভাষা জানতেন। তাঁর লেখা স্কুলে পড়ানো হয় পাঠ্যবই হিসেবে। তিনি যখন নাটোরে আসেন তৎকালীন সরকার সম্মানার্থে তাকে ২৮ বিঘা জমি দেয়। এমন আরও কত কথা! ইবরাহীম খাঁ সম্পর্কে আমার দাদা, চাচা, বাবার কাছে যত গল্প শুনেছি, তা দিয়ে গোটা দুয়েক বই লিখে ফেলা সম্ভব, সে ইচ্ছে আছে-ও।
২০১২ সালের দিকে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের আত্মজীবনীমূলক বই ‘বহে জলবতী ধারা’ পড়ার সময় প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ’র আত্মজীবনীমূলক বই ‘বাতায়ন’-এর কথা জানতে পারি। দ্রুত ‘বাতায়ন’ সংগ্রহ করে গভীর মনোযোগ সহকারে পড়ে ফেলি। ইবরাহীম খাঁকে নিয়ে একটা বই লেখার ইচ্ছে আমারও দীর্ঘ দিনের, বিশেষ করে তিনি যেভাবে আমাদের পরিবারকে নাটোরের স্থায়ী বাসিন্দা করার জন্য অবদান রেখেছেন তা নিয়ে লেখার ইচ্ছে আছে।
‘বাতায়ন’-এর ৪১২ থেকে ৪১৫ পৃষ্ঠায় ‘নৌকা পথে রোমান্স’ লেখায় মুচু (মোবারক খাঁর ডাকনাম), জালু (জালাল খাঁর ডাকনাম) নাম উল্লেখ আছে। এরা দুইজন আমার দাদার ছয় ভাইয়ের মধ্যে দুইজন। যদিও তাদেরকে আমি কখনো দেখিনি, শুধু মানুষের কাছে তাদের গল্প শুনেছি। আমার লেখা কবিতার বই ‘সহজ কথায় শুরু’ তে তাঁদের শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি কবিতায় লিখেছি,
গল্প শুনেই করছি তাঁকে স্মরণ-
না দেখে না ছুয়েই তাঁকে করছি বুকে ধারণ।
ইবরাহীম খাঁ হাজার গুণের আধার-
তাঁর কারণেই সম্মানিত আমাদের পরিবার।
চার.
আমি এ লেখাটির নাম দিতে চেয়েছিলাম ‘Link V.S. Naipaul with Mr Nayeb Ali Khan and his brothers’। নায়েব আলী খাঁ আমার দাদা, তাকে আমি দেখিনি, তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন সময়ে কেবল মাগফেরাত কামনা করেছি। তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানোর কোনো সুযোগ হয়নি কখনো। তাই এই চেষ্টা ছিলো। কিন্তু লিখতে গিয়ে ওই শিরোনাম আর দেওয়া হলো না। তার পরও এই লেখা আমার দাদা নায়েব আলী খাঁর স্মরণে পাঠকের কাছে সমর্পিত হলো।
লেখক : অডিট এন্ড একাউন্টস অফিসার, ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব একাউন্টস (ডিসিএ)-এর কার্যালয়, রাজশাহী বিভাগ, রাজশাহী।



