নলডাঙ্গা প্রতিনিধি : নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার বহুল আলোচিত শাহাদত হত্যাকান্ডের ত্রিশ বছর পর যাবজ্জাীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামী শাহজাহান আলী ওরফে সোহরাব হোসেন স্বপন (৫৪) কে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপীড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান ( র‌্যাব-৫)। শনিবার (২৩ জুলাই) দুপুরে র‌্যাবের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। এর আগে সকাল ৬টার দিকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাবের একটি অপারেশন দল।
আটক শাহজাহান আলী ওরফে সোহরাব হোসেন স্বপন নলডাঙ্গা উপজেলার পশ্চিম সোনাপাতিল গ্রামের মৃত হোসেন আলীর ছেলে। তার বর্তমান ঠিকানা দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি থানার পুর্ব কাটাবাড়ি গ্রাম। শাহাদত হত্যাকান্ডের পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে নাম-পরিচয় গোপন ও ঠিকানা পরিবর্তন করে বিভিন্ন স্থানে বসবাস করে আসছিলো শাহজাহান আলী ওরফে সোহরাব হোসেন স্বপন। নিহত শাহাদত হোসেন নলডাঙ্গা উপজেলার নলডাঙ্গা গ্রামের মৃত সমজান আলীর ছেলে। স্থানীয় নলডাঙ্গা বাজারে তার মাইক ও ব্যাটারী সার্ভিসিংয়ের দোকান ছিল। পাশাপাশি মাছের ব্যবসা করতেন তিনি। তার মৃত্যুকালে মেয়ে শারমিন সুলতানা সাথীর বয়স ৫ বছর, ছেলে মোঃ আব্দুল রউফ বাপ্পির বয়স ৩ বছর এবং ছোট ছেলে মোঃ বাবলা হাসানের বয়স ৭ মাস ছিল।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ফিরোজা নামে এক নারীকে বিয়ে করা নিয়ে শাহদত হোসেন ও শাহজাহান আলীর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। ওই বিরোধকে কেন্দ্র করে ১৯৯২ সালের ১৭ মে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাড়ি সংলগ্ন বারনই নদীতে গোসল করতে গেলে প্রকাশ্য দিবালোকে শাহজাহান আলীর ছুরিকাঘাতে খুন হন শাহাদত হোসেন। হত্যাকান্ডের পর থেকে আসামী শাহজাহান আলী আত্মগোপনে চলে যায়।এই ঘটনায় নিহতের ভাই সেকেন্দার আলী বাদী হয়ে জেলার সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর-১২, তারিখঃ ১৭ মে ১৯৯২, জিআর-৯৪/৯২ (নাটোর), ধারা- ৩০২ পেনাল কোড। পরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা একমাত্র আসামী শাহজাহানকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন।
স্বাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ১৯৯৫ সালের ২৯ মে নাটোর জেলার জেলা সেশন আদালত অভিযুক্ত শাহজাহান আলীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেন। একই সঙ্গে ৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদন্ড প্রদান করেন। এরপর দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে পলাতক ছিলো শাহজাহান আলী। পরে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী শাহজাহান আলীকে গ্রেফতারের ব্যাপারে র‌্যাব উদ্যোগী হয়ে গোয়েন্দা নজরদারী অব্যাহত রাখেন।
এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব-৫, সিপিসি-২, নাটোর ক্যাম্পের একটি আভিযানিক দল বিশেষ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আজ সকালে সিরাজগঞ্জ জেলার হাটিকুমরুল এলাকায় কোম্পানী অধিনায়ক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ ফরহাদ হোসেন এবং কোম্পানী উপ-অধিনায়ক, মোঃ রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করে যাবতজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী শাহজাহান আলী ওরফে সোহরাব হোসেন স্বপন (৫৪) কে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, গ্রেফতারকৃত শাহজাহানআলী ওরফে সোহরাব হোসেন স্বপন (৫৪) স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল। এরপর ১৯৯২ সালে শাহজাহান পার্শ¦বর্তী গ্রামে জনৈকা ফিরোজা বেগমকে বিয়ে করেন। ওই বিয়েকে কেন্দ্র করে শাহজাহান এবং মৃত শাহাদত এর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সৃষ্ট বিরোধকে কেন্দ্র করেই এই হত্যাকান্ড ঘটে। হত্যাকান্ডের পর শাহজাহান আলী দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী এলাকায় আত্মগোপনে চলে যায়। সেখানে ফুলবাড়ী পৌর সভায় নিজ পরিচয় গোপন করে “সোহরাব হোসেন স্বপন” নামে পরিচয় দেয়া শুরু করে। এছাড়া তার আদি নিবাস‘ রংপুর’ বলে দিনাজপুরে সবাইকে জানাত। প্রাথমিক পর্যায়ে সে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী এলাকায় বিভিন্ন কাজকর্ম করলেও গত ১০ বছর ধরে গাজীপুরে গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করছে। দিনাজপুর ফুলবাড়ীতে অবস্থানকালে সে তার নিজ নাম শাহজাহান এর পরিবর্তে “সোহরাব হোসেন স্বপন ” নামে একটি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরী করে। সে দিনাজপুর ও ঢাকায় অবস্থান করলেও গোপনে নিজ এলাকায় নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। শেষ পর্যন্ত র‌্যাবের জালে গ্রেফতার হলো শাহজাহান আলী।
র‌্যাব-৫, সিপিসি-২, নাটোর ক্যাম্পের কোম্পানী অধিনায়ক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ ফরহাদ হোসেন এবং কোম্পানী উপ-অধিনায়ক, মোঃ রফিকুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।