বাড়ির দক্ষিণ দিকের জোড়-আমগাছ কাটা পড়ল নতুন করে ইটের পাকা-ঘর তৈরির সময়। মা একবার কী ভেবে নিষেধ করেছিল না-কাটার জন্য। আর ঠাকুমা এক কাঠি সরেস হয়ে একপ্রকার ক্ষেপেই গিয়েছিল তার নিজের হাতে যতœ-আত্মি করা গাছ কাটা পড়ছিল দেখে। বেশ কয়েক বছর ধরে নিয়মিত ফল দিয়েছে গাছ-জোড়া। একটা কালুয়া আম আর অন্যটা যে কী আমের গাছ তা আজও আমরা জানতে পারিনি বা জানার চেষ্টাও হয়তো করিনি। একে অপরের সাথে গা লেপ্টিয়ে বড় হওয়া আমগাছ যুগলকে কাটার সময় একবার মনে পড়েছিল সেদিনের সেই ঘটনার কথাটা।… পনেরই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমরা ভোট দিতে যাইনি, আমাদের মতো পাড়ার বেশির ভাগ লোকই অবশ্য যায়নি সেদিন ভোটকেন্দ্রে। তারপরও সেদিন নাকি ভোট হয়েছিল, তারপর দেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছিল। তবে সে-সরকার বেশিদিন টেকেনি, ভেঙে গিয়েছিল শপথ নেয়ার দিনকয়েক পরেই।… তার কিছু পরেরই ঘটনাÑ
সেদিন ছিল চৈত্রের শুরুর দিকের গুমোট ভাব ধরা সন্ধ্যা। পশ্চিমে সারাদিনের সূর্য ডুবে গিয়েছে অনেক আগেই। ঘরে ঘরে সন্ধ্যা বাতিও জ্বলে প্রায় নিভু নিভু অবস্থা। অন্ধকারে ঢেকে গিয়ে একটু একটু করে রাত নেমে আসছে। প্রায় দৈনিকের অভ্যাসের মতো ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। ঘরে বাতি নেই, ফ্যানও বন্ধ। ভ্যাপসা গরমে ঘরে বসে থাকা যাচ্ছে না বিধায় দক্ষিণ ও পশ্চিম দুয়ারি ঘরের বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে বাড়ির প্রায় সকলেই। শহরে বাবার ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্যের দোকান, সেই সুবাদে নানান ধরনের মানুষের সাথে উঠা-বসা। বাবা ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি কিছুটা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। শুক্রবার হওয়ায় সেদিন সন্ধ্যার পরবর্তীতে বাইরে কাজ না থাকায় সকলে বাড়িতেই ছিলেন। মেয়েদেরও সন্ধ্যাবাতি দেওয়ার পর একটুখানি অবসর। বাবা আর ছোটকাকা দক্ষিণ দুয়ারে আর পশ্চিম দুয়ারে আমরা ভাই-বোন মা ঠাকুমা মিলিয়ে চলছিল নানান রকম গল্প, দূরের আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে কথাবার্তা। আর হাতপাখাতে গায়ে একটু একটু হাওয়ার যোগান। হঠাৎ একটা বিস্ফোরণের শব্দে সকলেই সচকিত হয়ে প্রথমে খোলা বারান্দায় পরে একজন অন্যজনকে ধাক্কিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা আটকে দেয়া। মিনিট কয়েক নিরবতা, একেবারে ঘরে খিল এঁটে দেওয়ার মতো মুখেও খিল এঁটে দেয়া। প্রথমে কারো মুখে কোনো কথা না বের হলেও বাড়ির মেয়েদের মৃদু কান্নাতে বাচ্চাদের কান্না সংক্রমিত হয়। বাবা প্রথমে বাইরের আপাতত শান্ত ভাব দেখে ঘরের দরজার খিল খুলতে গেলে মা ঠাকুমা মিলে কান্নার রোল তুলে বাধা দেয়। মায়ের মুখ শুকিয়ে গেছে, বাবাও এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একেবারে যেন চুপসে গেছেন। ঠাকুমা একাত্তরে যুদ্ধের সময় চার চারটা ছেলে-মেয়ের সাথে ব্যাগ-বোচকা নিয়ে একা ইন্ডিয়ার বর্ডার পার হওয়া মানুষ, তার অবস্থা দেখে বাবার সাহস আচমকা দমে যায়। সময় দ্রুত যেতে থাকলে বাবা এক সময় সাহস সঞ্চয় করে দরজার খিল খুলে বাইরে পা ফেলেন। বাইরে ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। ইলেকট্রিসিটি আসবে আসবে মনে করেও কেরসিনের বাতিটা জ্বালানো হয়নি তখনো। চকিত মনে পড়ে, বারান্দায় বসে বসে গল্প চলাকালীন সময়ে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ… এক মুহূর্তের আলোর ঝলকানি… ঘরের টিনের চালায় কাঁচ বা পাথরের গুঁড়ো ঝরে পড়ার শব্দ যেন ছিল প্রাচীনকালের নীরবতামুখর একটা মুহূর্ত। অথচ এই তো সময়, বিস্ফোরণের পাঁচ মিনিটও পার হয়নি। তরতাজা প্রমাণ থেকে গেছে বারান্দা ও বোধকরি সন্ধ্যায় ঝাট দেয়া ঝকঝকে পরিষ্কার উঠানেও। অন্ধকারে চোখ দুটো একটু একটু করে সয়ে গেলে চোখের সম্মুখে আবছা অনেক কিছুই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বারান্দা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাঁচের টুকরো আর পাথরের গুঁড়ো। বারুদের গন্ধ তখনো মিলিয়ে যায়নি। রাতের আকাশ তখনো তেমন একটা অন্ধকারে ঢেকে যায়নি। আকাশের দিকে তাকালে চোখে আটকে যায় বাড়ির দক্ষিণ দিকের জোড়-আমগাছটা। যেখানে মুহূর্তের আলোর ঝলকানি দেখা দিয়েছিল, আর চোখের পলকে হয়তো সকলেই তা দেখেছিল।… ঘরের দরজা খুলে দু-একজন করে মুখে-চোখে-মনে আতঙ্ক নিয়ে তখন বাইরে বেরিয়ে আসছিল। বাচ্চাদের ঘরে বেঁধে রেখেছিল আমাদের মা, অধিক আতঙ্কিত হয়ে কান্নাও থামিয়ে দিয়েছিল। একটা ককটেল বিস্ফোরণÑ যা এই বাড়ির মানুষেরা কখনো কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি, যা এই বাড়িতে এই প্রথম ঘটল!
সেদিন রাতে কোনো প্রতিবেশি বা পাড়ার কেউ জানতেও আসেনি বা কোনো খোঁজও নেয়নি সন্ধ্যায় আসলে আমাদের বাড়িতে হঠাৎ করে কী ব্যাপার ঘটেছিল। পরদিন সকালে দু-একজন জানার পরে আর তেমন কেউ ব্যাপারটায় আগ্রহ দেখায়নি। বাড়িতে মা ঠাকুমা আতঙ্কিত মন নিয়ে বাড়ির কাজকর্ম স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেও যেটুকু না করলেই নয় সেইটুকুই করেছিল। বাবা কাকা অন্যান্য দিন একটু রাত করে বাড়ি ফিরলেও সেদিন থেকে সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। প্রতিদিনের নির্ধারিত রুটিন ভেঙে বাচ্চাদের একটু আগে আগে খাইয়ে নিজেরাও খেয়ে বিছানায় গড়িয়েছে মা ঠাকুমা। যে বাড়িতে রাত বারোটা অবধি বাড়ির বড়দের ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস নেই সেই বাড়িতেই সন্ধ্যা হতে না হতেই দরজায় খিল এঁটে দেয়া প্রধান কাজ হয়ে গিয়েছে যেন। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলেই সারা বাড়ি জুড়ে যেন শ্মশানের নিরবতা। দিনের আলোয় দক্ষিণের জোড়-আমগাছের নিচে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল লাল রঙের টেপ দিয়ে জড়ানো সুরভি জর্দ্দার টিনের কৌটা। বাড়ির ভিটেমাটির পাশে কোমর সমান নিচু খাল থেকে ছুঁড়ে মারা হয়েছিল বস্তুটা। সেটা যে জোড়-আমগাছের খাঁজে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে তা হয়তো ভাবেনি তারা। আর লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়ে যদি সেটা সোজা দক্ষিণ দুয়ারি ঘরের বারান্দায় গিয়ে পড়ত তাহলে হয়তো তাদের মনোবাসনা পূর্ণই হতো।
জর্দ্দার কৌটায় বানানো ককটেল বিস্ফোরণের দুই দিন পেরিয়ে তৃতীয় দিনের সন্ধ্যা আসে সেদিন। মন থেকে প্রথম দিনের আতঙ্ক কিছু কিছু করে কাটিয়ে সকলে হয়তো স্বাভাবিকের মতো হয়ে আসছিল। বাবা কাকা বাইরের কাজকে গুরুত্ব দিয়ে একটু রাত করে বাড়ি ফেরার চিন্তা করছিল। সন্ধ্যা গড়িয়ে সেদিনও রাত নেমেছিল, একটু একটু করে অন্ধকার হয়ে আসছিল চারদিক। বারান্দায় বসা আমাদের পড়াশোনা আগের মতোই হচ্ছিল। মায়েদের সাংসারিক কাজকর্মও চলছিল স্বাভাবিক গতিতে। হঠাৎ কালো অন্ধকার ফেঁড়ে-ফুঁড়েÑ সর-সর-সর… ঝন-ঝন-ঝন… ঝনাৎ শব্দে বাড়ির সকলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ছুটোছুটি পড়ে যায় সবার মাঝে, হাতের কাজকর্ম ফেলে মা আমাদের ভাই বোনদের কোলে তুলে হাত ধরাধরি করে সশব্দে ঘরের খিল এঁটে দেয়। আমরা কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মায়েদের এই কাজে ফের আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। ঘরে ঘরে আবার কান্না ওঠে, সময়ে গড়িয়ে গেলেও মায়েরা আর খিল খোলে না। বাইরে একটু আগে রান্নাঘরে মায়ের চুলার ওপরে ভাতের হাঁড়িতে দেয়া চাল ফুটতে থাকে আপনা আপনিই, ঘরে কেরোসিনের কুপি বাতি জ্বললেও সেখানে কারো উপস্থিতিই নেই। বাড়ির ভেতর যেন শ্মশানের ছায়া, আতঙ্কে বাড়িতে থেকেও যেন কেউ নেই।
অনেক পরে বাবা কাকা বাইরের কাজ থেকে বাড়ি ফিরলে সকলেই দেখে অসময়ে ঘরের দরজা বন্ধ। বাচ্চাদেরও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। অজানা কিছুর আশঙ্কা থেকে জোরে জোরে দরজা ধাক্কিয়ে ডাকে সবাইকে। কিছুক্ষণ পরে সকলে সশব্দে দরজা খুলে আতঙ্কিত মুখে দাঁড়ালে তারা জানতে চায় আতঙ্কের কারণ। বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে মা সেদিনের মতো ঘটনার কথা আতঙ্কমাখানো মুখে অল্প অল্প করে বলতে থাকে তাদের। বাবা প্রথমে সন্দেহ করে, পরে কিছুটা আতঙ্কিতও হয়। ঘরে ঢোকার কথা ভুলে গিয়ে উঠান ও বারান্দায় কাঁচের টুকরা ও পাথরের গুঁড়ো খুঁজতে থাকে। কিছু না পেয়ে টর্চ হাতে বাড়ির আঙিনায় খোঁজাখুঁজি করে, কিছুই মেলে না। বাড়িতে ঢোকার সরু পথে নারকেল গাছের নিচে দুটো শুকনো ডাগুর দেখে সন্দেহে কপালে ভাঁজ পড়ে। যা বুঝে নেওয়ার বুঝে নিয়ে বাড়িতে গিয়ে বাড়ির মেয়েদের বুঝিয়ে আতঙ্ক দূর করতে চেষ্টা করে।
মায়ের মন থেকে আতঙ্ক কাটে না। সন্ধ্যা হতে না হতেই মা ঘরের সমস্ত কাজকর্ম শেষ করে আমাদের নিয়ে ঘরে ঢোকেন। বাড়ির আশে পাশে খুটখাট শব্দে মায়ের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, ভয়ে ভীত হয়ে পড়েন। কোনো কোনো দিন সামান্য ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ি শব্দে মা ভীত হয়ে ঘরে দৌড়ে আসেন। বলে ওঠেন, ‘দ্যাখ তো কিসের শব্দ হলো?’
আমরা মায়ের এমন ভয় পাওয়া দেখে হেসে উঠি, ‘মা, এই সামান্য ইঁদুর দৌড়ানোর শব্দে ভয় পেলে!’
আবার সেদিন বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে একটা ট্রাক আচমকা বিকট শব্দে ছুটে গেলে মা সব ফেলে রান্নাঘর ছেড়ে দৌড়ে এসে শোয়ারঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মায়ের ভয়ার্ত মুখটা দেখে অবশ্য আমাদের খুশি হওয়ার বদলে খারাপই লাগে। মা ভয় পেলে মুখ-চোখ শুকিয়ে ফেলেন, তার মুখটা কেমন খুকি খুকি হয়ে যায়। মাকে ভয় পাওয়া বাচ্চা মেয়েদের মতো লাগে দেখতে। মা তখন চোখমুখের ভয়ভাব দূর করতে এবং আমাদেরকে ভয় বোঝাতেই হয়তো দেশের যুদ্ধের কথা স্মরণে এনে আমাদের শোনাতে থাকে, ‘তোরা তো যুদ্ধ দেখিসনি তাই ওরকম করছিস। যুদ্ধের মধ্যে আমাদের কী যে অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাতে হয়েছিল।…’
আমরা কেউ একাত্তরের যুদ্ধ দেখিনি, আমাদের ভাই-বোনদের কারোরই জন্ম হয়নি তখন। মা যখন এবাড়িতে নতুন বউ হয়ে আসে তখন তার কিশোরী বয়স। যুদ্ধের ঠিক আগের বছর বিয়ে হয় তার। বয়স অল্প হওয়ার কারণে তখন ঘন ঘন শ্বশুরবাড়ি-বাপের বাড়ি যাতায়াত চলছিল। ফাল্গুন মাসের শেষের দিকে চৈত্রমাস মানতে বাপের বাড়ি নাইয়রে গেলে সে-সময় আর ফেরা হয়নি। দেশে তখন শুরু হয়ে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। ঢাকা থেকে শুরু হওয়া পাকিস্তানি তা-ব যেন বাতাসের আগে আগে দেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে গ্রামে ঢুকে গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হলে মা শ্বশুরবাড়িতে ফিরে এসে দেখেছিল আগের বাড়ি-ঘর একটাও নেই। কেবল মাটির পাট দিয়ে বাঁধাই করা জলের একমাত্র কুয়াখানা টিকে আছে। আর কুয়ার মধ্যে তাড়াহুড়ো করে ফেলে যাওয়া ঘরের কাঁসা-পিতলের বাসনগুলো এসে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঘর-বাড়ির জায়গায় না কি কে বা কাহারা কলাগাছ পুঁতে দিয়েছে। আর সেখানে এখন নতুন করে বাঁশের বেড়া, মাটির টালির চালে বাড়ি-ঘর তৈরি হচ্ছে। কিন্তু মা যুদ্ধের বছরের ঘটে যাওয়া ঘটনা সমূহের পুরো স্মৃতিটাই বয়ে নিয়ে এসেছে বাপের বাড়ি থেকে। মায়ের বাবার বাড়ি অর্থাৎ আমাদের মামার বাড়ির ধারে কাছে ইন্ডিয়াতে যাওয়ার কোনো বর্ডার না-থাকায় সে অঞ্চলের মানুষ দিনে-দুপুরে খেয়ে না-খেয়ে জলে জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে থেকে দিন পার করেছে। গ্রামটা থানা শহর থেকে বেশখানিকটা দূর হওয়ায় সেখানে দিনের পর দিন শহরের অনেক মানুষই পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। ‘এই মিলিটারি আসছে!… মিলিটারি আসছে!’Ñ এমন হুজুগে এলাকার কিছু মানুষই সবাইকে ভয় পাইয়ে তটস্থ রেখেছিল আর সময় সুযোগ বুঝে তাদের ঘর থেকে মালামাল লুট করেছিল। থানা শহর থেকে গ্রামে ঢোকার একটামাত্রই কাঁচা রাস্তা, দুই ধারের বিস্তীর্ণ বিশাল বিলের বুক চিড়ে এঁকে-বেঁকে তৈরি হয়েছে। যা নতুন মাটি গরমকালে যেমন ধুলাবালিতে পা ডুবে যায় তেমনি বর্ষাকালে অসম্ভব কাদায় পা ডুবে হাঁটা-চলা মুশকিল হয়ে পড়ে। এলাকার প্রায় সব মানুষই বিলের মধ্য দিয়ে চলমান নৌকায় যাতায়াত করতে অভ্যস্ত। দেশে যুদ্ধের কথা শুনে নৌকাওয়ালা তাদের নৌকা জলের তলে লুকিয়ে যে যেখানে পেরেছে পালিয়েছে তখন। সে-গ্রামে পাক-মিলিটারিরা তেমন ঢোকার সুযোগ করে উঠতে পারেনি, তবে এলাকার পাক-সমর্থিতরা তাদের কাজ-কর্মও থামিয়ে রাখেনি। যে যেভাবে পেরেছেÑ কারো ঘরের নগদ টাকা সোনা-রূপা, কারো ভিটেতে বাঁধা গরু-মহিষ, কারো ছাগল-ভেড়া কিংবা হাঁস-মুরগিও বাদ দেয়নি। আবার মাঠের ফসল থেকে শুরু করে বাড়ির আঙিনায় মাচায় দোল খাওয়া লাউ-কুমড়াকে মনে করতো তাদের নিজেদের সম্পদ। একদিন ওদের সশরীরে বাধা দিতে গেলে বেধে যায় গ-গোল। হাতের নাঙা ছোরা গলার কাছে ধরে শাসিয়ে যায় ‘দেখে নেবে’ বলে। দিনের পর দিন পাক-মিলিটারির হুজুগ শোনা গেলেও একদিন সত্যি সত্যি এক ট্রাক মিলিটারি সেই ধুলামাটির রাস্তা ধরে ঢুকে পড়ে গ্রামের মধ্যে। গ্রামের মধ্যে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশুর মধ্যে হুড়োহুড়ি ছুটোছুটি পড়ে যায় মুহূর্তেই। পুরুষরা দরকারি যা কিছু বুকে চেপে ধরে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ে, মায়েরা শিশুদের কান্না থামাতে মুখ চেপে ধরে দৌড়াতে থাকে পুরুষদের পিছুপিছু।… দাদুরা তাদের এতো বড় বাড়ি, বাড়িতে থাকা বিভিন্ন জিনিসপত্র ছেড়ে কোথায় যাবে ভাবতে ভাবতেই বদরবাহিনীর ছেলেদের সাথে পাক-মিলিটারি বন্দুক নিয়ে হাজির হয় বহির্বাটিতে। দুই মামা কয়েকদিন আগেই রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে থানা শহরে মিষ্টির দোকানে আশ্রয় নিয়েছে, মিষ্টির দোকান তখন বন্ধ থাকে। বড়মামা বাড়িতে থাকেন সবাইকে নিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে। সেদিনও বাড়িতেই ছিলেন, পাক-মিলিটারির দলটা বাড়ির ভেতর ঢুকে দাদুদের সামনে গিয়ে তাদের ছেলেদের খোঁজ করে। বড়মামা বাড়ির কাছে বাঁশঝাড়ের পাশে ডোবায় কচুরিপানার নিচে ডুবে আছেন। মা-মাসী-দীদারা কিছুক্ষণ আগেই বাঁশঝাড় ডিঙিয়ে কয়েকবাড়ি পরে একটা ভাঙ্গাকুটিরে লুকিয়ে পড়েছেন তখন। দাদুরা একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে মামাদের কথা জানাতে অস্বীকার করলে বন্দুকের বাট দিয়ে দু-জনকেই পেটাতে থাকে। দাদুরা বয়সের ভারে আর একাধারে বন্দুকের বাটের আঘাত সহ্য করতে না পেরে মাটিতে শুয়ে পড়ে। তারপরও পাক-মিলিটারিদের পেটানো থামে না, দুজনের একজন হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। বড়মামা সে-দৃশ্য দূরে জলাবদ্ধ কচুরিপানার ডোবা থেকে মাথা তুলে দেখে সহ্য করতে না-পেরে উঠে আসেন। আর মুহূর্তে পাক-মিলিটারির বন্দুক গর্জে ওঠে, মামা মুহূর্তে লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। বদর বাহিনীর ছেলেরা ঘর তল্লাসি করে হাতের কাছে যা পেয়েছিল তা নিয়ে ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঘরের চারদিকে। ঘর পুড়তে থাকে চড়চড় শব্দে, আগুনের লেলিহান শিখা আমগাছের মাথা ছোঁয়। আগুন গাছের কাঁচা ডাল-পাতায় লেগে পুড়ে যায়। মাটিতে পড়ে কাতড়াতে থাকা দাদুর শরীরে শক্তি নেই উঠে দাঁড়ানোর। জ্ঞান হারানো অন্যজনকে কোনো মতে জড়িয়ে ধরে একদিকে সন্তানের লাশের দিকে তাকায় আবার অন্যদিকে আগুন-লাগা ঘরের দিকে তাকায় অসহায়ভাবে।Ñ আমরা আমাদের মায়ের মুখে এই সকল গল্প শুনে আতঙ্কবোধ না-করলেও দুঃখে ব্যথা অনুভব করি, ব্যথিত হই। মুহূর্তে আমরা চোখ-মেলে পৌঁছে যাই মামার বাড়ির আঙিনায়। যেখানে আমাদের স্কুল ছুটির দিনের কিছু সময়ের অনাবিল আনন্দমুখর শৈশব কাটিয়ে আসি। আর আমাদের মা কিশোরী বয়সে বিয়ে পরবর্তী সময়ের পুরো যুদ্ধকালটাই সেখানে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে এক বুক বেদনা নিয়ে ফিরে এসেছেন আমাদের সংসারে।